ক্রিপ্টোকারেন্সি ট্রেডিং কি হালাল?

চলুন একটু অনুসন্ধান করি। ক্রিপ্টোকারেন্সি কেন হালাল অথবা হারাম। এসম্পর্কে শরিয়াহ্ কি বলে?  যারা ক্রিপ্টোকারেন্সিকে কোন শর্ত ছাড়ায় হারাম বলে ফতোয়া দেন আগে তাদের কিছু পয়েন্ট দেখে আসি।

 (১) এটি রাষ্ট্রকতৃক স্বীকৃত নয়। 

 (২) মাদকের লেনদেন থেকে শুরু করে হ্যাকিং ও বিভিন্ন হারাম কাজে পেমেন্ট হিসাবে ক্রিপ্টো ব্যবহার হয় 

(৩) ক্রিপ্টো কেনাবেচা জুয়ার অন্তর্ভুক্ত।

(৪) বিটকয়েনের অন্তর্নিহিত বা নিজস্ব কোন মূল্য নাই।

 

এবার আমরা একটু পর্যালোচনা করার চেষ্টা করি যে তাদের উক্তি সমূহের যৌক্তিকতা। 

(১) ২০২২ সালে দাড়িয়ে আমরা যত পরাশক্তি রাষ্ট্র চিনি যেমন: য়ুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, রাশিয়া, ফ্রান্স, কানাডা, এমন কি প্রতিবেশী দেশ ভারত ও ক্রিপ্টোকারেন্সি তথা বিটকয়েনকে অনুমোদন দিয়ে দিয়েছে। এল সালবাডোর নামে একটি দেশ বিটকয়েনকে লিগ্যাল টেন্ডার হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অর্থাৎ আপনি সেখানে চুল কাটার পর সেলুনেও বিটকয়েন এ পেমেন্ট করতে পারেন এবং সামনের জন সেটা গ্রহন করতে বাধ্য।  তাহলে প্রথম পয়েন্ট টা কি দাড়াল? আমেরিকায় বিটকয়েন হালাল এবং বাংলাদেশে হারাম। আচ্ছা, আরেকটা উদাহরন দিই ভালো বুঝবেন। বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই মদ বিক্রির লাইলেন্স দেওয়া হয়ে থাকে। এমনকি যারা নিজেদের ইসলামিক স্টেট বলে দাবি করে তাদের দেশেও মদ খাওয়া ও বেচা সম্পূর্ন বৈধ। বর্তমানে প্রত্যকটি দেশের অর্থনীতির ভিত্তি হচ্ছে সুদ। ব্যাংকিং ব্যবস্থা পুরাটা দাড়িয়ে আছে সুদের ওপর। তাহলে রাষ্ট্রীয় অনুমোদন পাওয়ার পর মদ আর সুদ হালাল হয়ে গেল?

 

(২) অবৈধ কাজের লেনদেন হিসাবে ব্যাবহর হয় বিটকয়েন। (আমি বিটয়েন বলতে পুরা ক্রপ্টো স্পেসকে বুঝাচ্ছি)  আমি যদি তথাকথিত হালাল কাগজের টাকা দিয়ে মাদক কিনি অথবা কোন হ্যাকারদের পেমেন্ট করি। তাহলে দোষ কি কাগজের টাকার? *(তথাকথিত হালাল কাগজের টাকা কেন বললাম এটারও ব্যাখ্যা দিচ্ছি)  অবশ্যয় দোষ আমার। হারাম কাজে কাগজের টাকা ব্যাবহার করলেও কাগজের টাকাকে কেও হারাম মনে করে না। কিন্তু বিটকয়েন হারাম।

 

(৩) বিটকয়েনকে জুয়া খেলা বলার পিছনে তাদের যুক্তি হলো ২০০৯ সালে বিটকয়েনের দাম ১$ এর কম ছিল। কিন্তু ০৮-০২-২০২২ তারিখ অনুযায়ী বিটকয়েন এর বতর্মান মূল্য ৪৪হাজার ডলার। এটা বুঝার জন্য চলুন আমরা আরো একটা ছোট্ট উদাহরন দেখে আসি। আমরা  যদি গত ১৫ বছর আগের চিত্র দেখি তাহলে ১ ভরি স্বর্নের দাম ছিল ৮-১০ হাজার টাকা। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ৭০ হাজার টাকা। স্বর্ণের দামের এই আকাশচুম্বী মুল্যবৃদ্ধির কারন কি? কারন হল Demand & Suply. সোজা হিসাব। যখন বাজারে কোন জিনিসের যোগানের চেয়ে চাহিদা বেড়ে যায় তখন তার দাম স্বাভাবিক ভাবেই বৃদ্ধি পাবে। তাহলে স্বর্ণের বেলাই কি হচ্ছে? আমরা সবাই জানি পৃথিবীতে একটি নির্দিষ্ট পরিমানে স্বর্ণ আছে অর্থাৎ Limited Supply. এবং চাহিদা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে, যার কারনে স্বর্ণের দামও বেড়ে যাচ্ছে। বিটকয়েনের বেলায় ও একই ব্যাপার। পৃথিবীতে কোবলমাত্র ২১ মিলিয়ন বিটকয়েন মাইন বা উৎপাদন সম্ভব। যার ফলে চাহিদা বারার সাথে সাথে বিটকয়েনের দামও বাড়ছে।

 

(৪) আপনারা যে পুরাদিনের পরিশ্রমের দাম হিসাবে দিন শেষে কিছু কাগজের নোট পাচ্ছেন। ভেবে দেখেছেন কি কখনো এই কাগজের টাকার নোটের কোন নিজস্ব মূল্য আছে কিনা? আপনার হাতে থাকা ১০০০ টাকার নোটটির কি অন্তর্নিহিত দাম আছে?কাগজই ত একটা। আপনি কি মনে করেন কাগজের টাকা ইসলাম সমর্থিত? তাহলে আপনার অবগতির জন্য বলি --  ইসলমিক কারেন্সি বা শরিরাহ্ অনুমোদিত মুদ্রা ৬ টি। 

1. স্বর্ণমুদ্রা  2. রৌপ্যমুদ্রা  3. খেজুর  4. লবন  5.  যব  6. গম 

একটু লক্ষ করলে দেখতে পাবেন ৬টির মধ্য কাগজের মুদ্রা বা কাগজের মুদ্রা জাতীয় কিছুই নেই। কিন্তু শরিরাহ্ অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও কাগজের টাকা আমরা অবাধে ব্যাবহার করছি। এবং সবচেয়ে অশ্চর্যের ব্যাপার আমরা এটাকে হালাল মনে করছি। আসলে প্রচলিত টাকা এক টুকরা কাগজ ছাড়া আর কিছু না। ১ টা ১০০০ টাকার নোট প্রিন্ট করতে কাগজ, কালি সব মিলিয়ে সরকারের খরচ করতে হয় ৮.৫০ টাকা এর মত। কিন্তু আমাদের কাছে এটার দাম ১০০০ টাকা। এরপরেও যদি বুঝতে সমস্যা হয় তাহলে আরেকটা উদাহরন দিই। সরকার যদি আজকে ঘোষনা করে যে আজকে থেকে আমরা বর্তমানে ব্যাবহাক কৃত নোট গ্রহন করব না। আপনার কি মনে হয়? এই ঘোষনার পরে আপনি আর হাতে থাকা ১০০০ টাকার নোটটি দিয়ে বাজার থেকে আলু কিনতে পারবেন? কে নিবে আপনার কাছ থেকে এই নোট? এটা এখন শুধুই একটি রঙিন কাগজের টুকরা। সরকার চাইলেই এমন পদক্ষেপ নিতে পারে যার প্রমান ভারতের ৫০০ টাকার নোট বাতিলের ঘটনা। মুহুর্তেই কোটি কোটি রূপি অর্থহীন হয়ে পড়ে।কাগজের টাকা সৃষ্টির ইতিহাস এবং কাগজের টাকা কেন বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রতারণা ; এসম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন  আর এ কেমন মুদ্রা? বাংলাদেশে আমি যা ইচ্ছা তা কিনতে পারলেও এই বাংলাদেশি টাকা নিয়ে জাপানে কিছু করা যাবে না। বাংলাদেশের ৮৪ টাকায় টাকায় আমেরিকান ১ ডলার কিন্তু কেন? কাগজের মধ্যে কেন এত পার্থক্য আবার? তাহলে চলুন এবার আরেকটু গভীরে যাওয়া যাক! এত সমস্যা থাকার পরেও সরকার কেন কাগজের নোট এত পছন্দ করে এবং কেন বিটকয়েনকে কেন সরকারের শত্রু।  কাগজের টাকার সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে ইচ্ছামত টাকা ছাপানো য়ায়। সরকার চাইলেই যত ইচ্ছা টাকা ছাপাতে পারে কিন্তু বিটকয়েনর ক্ষেত্রে তো সেটা সম্ভব নয়। তাহলে সরকার ইচ্ছামত টাকা ছাপালে আমাদের কি সমস্যা? আর বিটকয়েন এর মধ্যেই বা কি সুবিধা?      কাগজের টাকায় সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ইনফ্লুয়েশন বা মুদ্রাস্ফীতি। অর্থাৎ টাকার মান কমে যাওয়া। একটু ভালোভাবে খেয়াল করলে দেখবেন যে টাকার মান দিন দিন কমলেও তার বিপরীতে কিন্তু বিটকয়েনের মান দিন দিন বাড়ছে। মনে করুন আপনার কাছে এখন ১ লাখ টাকা আছে এবং আপনি সেটা দিয়ে এখন হয়ত ২ টা গরু কিনতে পারবেন।  কিন্তু আপনি যদি সেই টাকা ১০ বছর রেখে দেন, এবং তার পর সেটা দিয়ে কিছু করতে চান, তাহলে দেখবেন আগে যেই ১ লাখ টাকা দিয়ে আপনি ২ টা গরু কিনতে পারতেন ১০ বছর পর এখন সেই টাকা দিয়ে একটা ছাগল পাচ্ছেন আরো ১০ বছর পর দেখবেন সেই ১ লাখ টাকাই মুরগী ও পাচ্ছেন না। এই চিত্র আমরা এখনও  দেখছি। যদি ১৫ বছর আগের কথায় ধরি তখন  ১ কেজি চাউলের দাম ছিল ১৫ টাকা। এখন কেজি ৬০ টাকা,।  ভাই সমস্যা কি?? টাকার মান কমছে কেন?  ৬০ টাকার মান ১৫ টাকায় এলো কেমনে? এটাই হচ্ছে মুদ্রাস্ফীতি।  বিটকয়েন এ এই সমস্যা নেই। বিটকয়েনকে তাই ডিজিটাল গোল্ড ও বলা হয়। মোটকথা কাগজের মুদ্রা ব্যবস্থা এটি অনেক বড় একটি প্রতারনা। এবং মূলত বিটকয়েনের জন্ম হয়েছে এই সমস্যাটার অবসান ঘটাতে। যারা বিটকয়েনকে হারাম বলে চালিয়ে দেন, কাগজের নোটের ব্যাপারে কি বলবেন? বিটকয়েনের বিরুদ্ধে যে সব কারন দেখানো হয় একটু ভালবাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে যে এ সবই অযৌক্তিক এবং হাস্যকর।

Post a Comment

Previous Post Next Post