কি এই পেট্রোডলার, পেট্রোডলারের সূচনা ও পেট্রোডলারের ইতিহাস। সারা বিশ্বে পেট্রোডলারের প্রভাব। যারা পেট্রোডলারের বিরোধীতা করেছিল তাদের অবস্থা কি হয়েছিল। চীন, রাশিয়া না পারলেও কেন আমেরিকা চাইলেই যে কোন দেশের উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে। পেট্রোডলার সিস্টেম কতটা ইসলাম সমর্থিত? কেনই বা আমরেকান ডলার আজকে বিশ্বের রিজার্ভ কারেন্সি? সমস্ত প্রশ্নের উত্তর জানার চেষ্টা করব আগামী কয়েক মিনিটে।

 

পেট্রোডলার কি :

বলা হয়ে থাকে আমেরিকা সারা বিশ্বে যেসব মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে পেট্রোডলার তার মধ্যে অন্যতম। পেট্রোডলার হল একটা চুক্তির নাম যেটা সাক্ষরিত হয়েছিল ১৯৭১ সালে সৌদিআরব এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে। চুক্তিটি ছিল এমন যে সৌদিআরব এবং অন্যান্য আরবদেশ গুলো ডলার ছাড়া অন্য কোন কারেন্সিতে তেল রপ্তানি করবে না।

 

পেট্রোডলারের সূচনার প্রেক্ষাপট :

পেট্রোডলার শব্দটি পেট্রোলিয়াম এবং ডলারের সংক্ষিপ্ত রূপ। পেট্রোডলার চুক্তির সূচনা হয় ১৯৭৩ সালে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট Richard Nixon সৌদিআরবের তৎকালীন বাদশা ফয়সালকে প্রস্তাব দেন সৌদিআরব যেন বিভিন্ন মুদ্রার বিনিময়ে তেল বিক্রি না করে শুধুমাত্র আমেরিকান ডলারের বিনিময়ে তেল বিক্রি করে। বিনিময়ে আমেরিকা সৌদিআরবকে পূর্ণ সামরিক নিরাপত্তা প্রদান করবে। আমেরিকার এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দেওয়া ছিল বিরোধীতার সামিল। এবং সৌদিআরবের প্রতিরক্ষা বাহিনীও তখন যথেষ্ট ছিল না। যার কারনে বাদশা ফয়সাল আমেরিকার প্রস্তাবে সম্মতি জানাই এবং জন্ম হয় পেট্রোডলার চুক্তির। এর পাশাপাশি ইতিহাসে আরও একটি ঘটনাকে পেট্রোডলার সৃষ্টির প্রক্ষাপট হিসাবে বিবেচনা করা হয়।  আরব, ইসরায়েল যুদ্ধকেও পেট্রোডলার জন্মের পিছনে দায়ী করা হয়। আরব, ইসরাইল যুদ্ধের সময় সৌদিআরবসহ বাকি দেশগুলো তেল বয়কট করেছিল। অর্থাৎ তারা ইসরাইল এবং তার মিত্র দেশগুলোকে তেল বিক্রি না করার সিদ্ধান্ত নেয়।ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৩৩ ডলার থেকে বেড়ে ৪০০ ডলারে পৌছে যায়। এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের দাম কমে যায়। এই সমস্যার সমাধান করতে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট Richard Nixon এবং ....  Kisinger সৌদি সরকারকে চাপ প্রয়োগ করার চেষ্টা করে কিন্তু ব্যর্থ হয়। এক পর্যায়ে আমেরিকা বলে আচ্ছা ঠিক আছে আমরা প্রতি ব্যারেল ৪০০ ডলার করেই তেল কিনব। তবে আমাদের একটা শর্ত আছে। আপনাকে চুক্তি করতে হবে যে আপনি ডলার ছাড়া অন্য কোন মুদ্রায় তেল বিক্রি করবেন না। তৎকালীন সৌদি বাদশা কিং ফয়সাল আমেরিকার চালাকি বুঝতে না পেরে সেই চুক্তিতে রাজি হয়ে যান এবং ১৯৭১ সালে সাক্ষরিত হয় পেট্রোডলার নামে একটি নতুন চুক্তি।সৌদিআরব মনে করেছিল আমরা তো উন্নতির দিকে চলে গেলাম আমাদের নির্ধারিত মূল্যেই তেল বিক্রি করব এবং প্রচুর ডলার আয় করবতবে পেট্রোডলার চুক্তি সৌদিআরবের থেকে বেশি আমেরিকার জন্য লাভজনক ছিল

 

সারা বিশ্বে পেট্রোডলারের প্রভাব:

বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান ধাতু হচ্ছে সোনা। তবে বর্তমান বিশ্বে সোনার চেয়েও যেটা বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠেছে সেটা হচ্ছে তেল। বৃটেন, ফ্রান্স, জাপান, রাশিয়ার মত পরাশক্তি গুলোও তেল ছাড়া একদিন চলতে পারবে না। আকাশে ওড়বে না কোন ফাইটার জেট, চলবে না কোন ট্যাংক, জাহাজ, সাবমেরিন। বন্ধ হয়ে যাবে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও। তেল ছাড়া চলবে না কোন কারখানা। এখন পেট্রোডলার চুক্তি অনুযায়ী কোন দেশ তেল কিনতে গেলে তাকে প্রথমে সেই দেশের মুদ্রা ডলারে এক্সচেঞ্জ করে নিতে হবে। এবং সেই ডলার দিয়ে আপনাকে তেল কিনতে হবে। মনেকরুন আপনি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কয়েকশো কোটি টাকা নিয়ে সৌদিআরবের বাদশাকে গিয়ে বলেন এই যে নেন একশো কোটি টাকা আমাকে কয়েক ব্যারেল তেল দেন। তবে আপনি কখনোই তেল পাবেন না। যতক্ষণ না পর্যন্ত আপনি বাংলাদেশি টাকা দিয়ে ডলার ক্রয় করে তার হাতে না দিচ্ছেন ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি কোন তেল পাবেন না । সে আপনি যেই দেশরই প্রেসিডেন্ট হোন না কেন তেল কিনতে হলে প্রথমে ডলার কিনতে হবে। তাহলে ব্যাপার টা কি হচ্ছে? প্রত্যেক দেশের তো তেল লাগবেই। আর তেল কিনতে চাইলে আপনাকে নির্ভরশীল হতে হচ্ছে আমেরিকান ডলারের উপর। তাই আমেরিকা চাইলেই যে কোন দেশের ডলার কিনার প্রক্রিয়া বাতিল করে দিতে পারে। ডলার ছাড়া যেহেতু কোন দেশ তেল কিনতে পারবে না তাই সব দেশেরই পরোক্ষভাবে আমেরিকার গোলামি করতে হয়। ধরুন যদি আমরেকা কোন দেশকে ডলার দেওয়া বন্ধ করে দেয় তবে সে কোনভাবেই তেল কিনতে পারবে না। এবং একটি দেশের জন্য এই তেল যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা তো একটু আগে ব্যাখ্যা করলাম। বুঝতেই পারছেন যে বিশ্বের বাকি দেশগুলো কিভাবে আমেরিকার কাছে বন্দী হয়ে আছে পেট্রোডলার চুক্তির কারনে। এখন পেট্রোডলার সিস্টেম আমেরিকার জন্য কিভাবে লাভজনক? প্রথমত আমেরিকা বাকি দেশগুলোকে ডলার বিক্রি করে প্রচুর লাভবান হচ্ছে। এবং দ্বিতীয়ত ডলার ছাপাতে আমেরিকার অন্য কারও অনুমতির দরকার হয় না। তাই আমেরিকা চাইলেই ডলার ছাপিয়ে ইচ্ছামত তেল কিনতে পারে। এবং আমেরিকা করেছেও ঠিক তাই। বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় তেলের রিজার্ভ আমেরিকার কাছে। 

 

পেট্রোডলার বিরোধীদের পরিণতি :

পেট্রোডলার সিস্টেম আমেরিকান ডলারকে করেছে শক্তিশালি এবং বাকি দেশগুলোকে করেছে আমেরিকার উপর নির্ভরশীল। পেট্রোডলারের এই বলয় ভাঙ্গার প্রচেষ্টা অনেক দীর্ঘ এবং রক্তাক্ত। ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন আন্তর্জাতিক তেল রপ্তানিতে স্বর্ণ ভিত্তিক মুদ্রাব্যবস্থা চালু করতে চেয়েছিলেন। ফলস্বরূপ ২০০৩ সালে মার্কিন বাহিনী ইরাক আক্রমন করে এবং সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করে। পরে তাকে হত্যা করা হয়তেল সমৃদ্ধ আরেক দেশ লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট গাদ্দাফিও স্বর্ণভিত্তিক মুদ্রাব্যবস্থা চালু করার ঘোষনা দিয়েছিলেন। পরে ২০১১ সালে তাকে ক্ষমতাচ্যুত এবং হত্যা করা হয়।

 

পেট্রোডলারের পতন:

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রকে পিছনে ফেলে চীন হয়ে ওঠেছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক দেশ। ২০১৮ সাল থেকে চীন তাদের চাইনিজ ইউয়ান দিয়ে তেল আমদানি করার চেষ্টা করছে। সম্প্রতি সৌদিআরব ঘোষনা করেছে যে, তারা পেট্রোইউয়ান অর্থাৎ চাইনিজ ইউয়ানের বিনিময়ে তেল রপ্তানি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এদিকে তেল রপ্তানিতে চাইনিজ ইউয়ান ব্যবহারের ফলে বৈশ্বিক পেট্রোলিয়াম বাজারে  ডলারের আধিপত্য কমে যেতে পারে এমনটাই মনে করছেন গবেষকরা। তবে পেট্রোইউয়ান সিস্টেম শুধুমাত্র চীনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। বাকি দেশ হুলো আগের মতো পেট্রোডলারের আওতায় থাকবে। সৌদিআরব তাদের তেলের প্রায় এক চতুর্থাংশ তেল বিক্রি করে চীনকে। তাই পেট্রোইউয়ান চুক্তি কার্যকর হলে আন্তর্জাতিক মহলে চাইনিজ ইউয়ানের মূল্যেও অনেকটা প্রভাব ফেলবে। যদি ইসলামিক দৃষ্টকোন থেকে পেট্রোডলারকে বিবেচনা করার চেষ্টা করি তবে এটি সম্পূর্ন হারাম একটি প্রক্রিয়া। মুক্ত বাজার অর্থনীতিকে এভাবে এককেন্দ্রিক করা ইসলাম সমর্থন করে না।

Post a Comment

Previous Post Next Post