২০০৮ সালের ১৮ই আগস্ট Bitcoin.org নামে একটি ডোমেইন নিবন্ধন করা হয়। একই বছরের নভেম্বর মাসে সাতোশি নাকামোতো হুয়াইট পেপার নামে একটি থিথিস পেপার প্রকাশ করেন। এরপর ২০০৯ সালে সাতোশি নাকামোতো বিটকয়েনের সোর্সকোড উন্মুক্ত করে দেন। এভাবে পৃথিবীর ইতিহাসে সৃষ্টি হয় নতুন এক অধ্যায় যার নাম ক্রিপ্টোকারেন্সি। ক্রিপ্টোকারেন্সি হল কোন এমন একটি মুদ্রাব্যবস্থা যা কোন অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান কিংবা অন্য কোন মধ্যস্থতাকারীর সাহায্য ছাড়াই প্রেরক থেকে প্রাপক সরাসরি লেনদেন করতে সক্ষম। প্রশ্ন হচ্ছে যদি কোন নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাই না থাকে তবে লেনদেন গুলো যে সঠিক সেটা যাচাই করবে কে? আমার কাছে কোন বিটকয়েন না থাকার পরেও যদি আমি আপনাকে ২ বিটকয়েন সেন্ড করে দিই তবে কি হবে? আমার একাউন্টে আসলেই সেই পরিমান ব্যালেন্স আছে কিনা বা আমি যাকে বিটকয়েন গুলো পাঠিয়েছি তার কাছে বিটকয়েন গুলো পৌছেছে কিনা এসব যাচাই করবে কে? এখানেই কাজে আসে মাইনার।


মাইনিং এর প্রকারভেদ 

বর্তমানে ক্রিপ্টোকারেন্সি দুনিয়ায় প্রায় ২০০৮৮ টি কয়েন রয়েছে। ক্রিপ্টোকারেন্সি মাইন করার দুটি পদ্ধতি রয়েছে। প্রুফ অফ ওয়ার্ক এবং প্রুফ অফ স্টেক। আমরা আজকে শুধু প্রুফ অফ ওয়ার্ক সম্পর্কে জানব। বিটকয়েন, বিটকয়েন ক্যাশ, মনেরো, ডোজ, লাইটকয়েন  এবং ২.০ আপডেট আসার আগ পর্যন্ত ইথারিয়াম কয়েনও প্রুফ অফ ওয়ার্ক পদ্ধতিতে কাজ করছে। অন্যদিকে বাইনান্স কয়েন, কারডানো, সোলানা, পোলকাডট, টিআরএক্স এসব প্রুফ অফ স্টেক পদ্ধতিতে মাইন করা হয়।


মাইনিং প্রক্রিয়া

যেসব কয়েন প্রুফ অফ ওয়ার্ক পদ্ধতিতে কাজ করে সকলের মাইনিং প্রসেস প্রায় একই। উদাহরন হিসাবে আমরা বিটকয়েন এর মাইনিং পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করব। মাইনিং কি এটা বুঝার জন্য ব্লকচেইন কিভাবে কাজ করে এ ব্যাপারে একটু ধারনা থাকা দরকার। ব্লকচেইন হল একটি পাবলিক লেজার আরেকটু সেজা করে বললে ব্লকচেইন হল এমন একটি খাতা যেখানে সব লেনদেন ব্লক আকারে লিপিবদ্ধ করা থাকে। প্রত্যেকটি ব্লক তিনটি উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। লেনদেনের তথ্য, ব্লকের হ্যাশ এবং পূর্ববর্তী ব্লকের হ্যাশ। লেনদেনের তথ্যের মধ্যে থাকে প্রেরক এবং প্রাপকের ওয়ালেট এড্রেস এবং লেনদেনের পরিমান। আর হ্যাশ হল প্রত্যেকটা ব্লকের ইউনিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট। এটি কিছু অক্ষর এবং সংখ্যার সমন্বয়ে তৈরী হয়। এখন মনেকরুন আমি আপনার ওয়ালেটে এক বিটকয়েন সেন্ড করলাম। এখন এই লেনদেনটির বৈধতা যাচাই করায় হল মাইনারদের কাজ। কিছু জটিল গানিতিক সমস্যা সমাধান করার পর যদি বেশিরভাগ মাইনার লেনদেনটি বৈধতার পক্ষে ভোট দেয় তবে আমার পাঠানো এক বিটকয়েন আপনার ওয়ালেটে পৌছে যাবে এবং লেনদেনটি ব্লক আকারে ব্লকচেইনে যুক্ত হয়ে যাবে। এবং আগামী দশ বছর পরেও যদি কেউ সেটি দেখতে চাই তবে সে তাও পারবে। এখানে বেশিরভাগ মাইনারদের কথা উল্লেখ করার কারণ হচ্ছে যদি আমাদের লেনদেনের ব্লকটি সমাধান করতে মোট ১০ জন মাইনার অংশগ্রহন করে থাকে এবং তারমধ্যে যদি ২ জন মাইনার বলে লেনদেনটি বৈধ নয় বা এক বিটকয়েন আমি আপনাকে নয় বরং সেই মাইনারের ওয়ালেট এড্রেসে সেন্ড করেছি অথবা এমন কোন জালিয়াতি করতে চাইলে সেটি ব্লকচেইনে গ্রহনযোগ্য হবে না। ৫১% মাইনার যেই সিদ্ধান্ত নিবে সেটিই সঠিক বলে বিবেচিত হবে। এখন কোন মাইনার যদি এমন কিছু করতে চাই তবে তাকে সেই ব্লক মাইনিং এর সাথে যুক্ত ছিল এমন ৫১% কম্পিউটার হ্যাক করতে হবে। যেটা বর্তমানে মোটেও সম্ভব নয়।


মাইনিং হার্ডওয়্যার

আপনি চাইলে আপনার কম্পিউটার দিয়েও বিটকয়েন মাইনিং শুরু করতে পারেন। তবে সমস্যা হচ্ছে বর্তমানে বিটকয়েন মাইনারদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে, কিন্তু মাইনিং রিওয়ার্ড কমে যাচ্ছে। শুরুতে প্রতিটা ব্লক মাইন করার জন্য ৫০ বিটকয়েন রিওয়ার্ড দেওয়া হতো। এবং প্রত্যেক চার বছর পর পর বিটকয়েন মাইনিং রিওয়ার্ড অর্ধেক হতে থাকে। এই প্রসেসকে বিটকয়েন হালভিং বলা হয়। যেহেতু প্রতিযোগীতা বেড়ে যাচ্ছে এবং রিওয়ার্ড কমে যাচ্ছে তাই মাইনিং প্রসেসও দিন দিন কঠিন হয়ে ওঠছে। লড়াই চলছে সবার আগে গানিতিক সমস্যা সমাধান করে রিওয়ার্ড হাসিল করার। যার কারনে প্রতিযোগীতার মাঠে টিকে থাকতে হলে দরকার উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন হার্ডওয়্যার। যেমন: মাইনিং রিগ, এসিক মেশিন। আপনি চাইলে নিজেই তৈরী করতে পারেন আপনার মাইনিং রিগ। মাইনিং রিগ তৈরী করতে যা যা লগবে - রিগ ফ্রেম, মাদারবোর্ড, প্রসেসর, গ্রাফিক্স কার্ড এবং পাওয়ার সাপ্লাই। অতিরিক্ত কুলিং ব্যবহার করতে পারলে ভাল হয়। মাইনিং এর সমস্ত গাণিতিক সমস্যা সমাধান করার কাজ হচ্ছে গ্রাফিক্স কার্ডের তাই গ্রাফিক্স কার্ডের সংখ্যা যত বাড়াবেন মাইনিং ও ততো বেশি করতে পারবেন। আপনি চাইলে ২ লাখ টাকা দিয়েও রিগ বানাতে পারেন। আবার চাইলে ১০ লাখ টাকাও খরচ করতে পারেন একটা রিগের পিছনে। তবে একটা কথা মনে রাখবেন যত বড় মাইনিং সেটআপ করবেন একদিকে যেমন বেশি বিটকয়েন মাইন করতে পারেন অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিলের জন্যও গুনতে হবে অতিরিক্ত টাকা।


মাইনিং থেকে আয়

প্রশ্নটা যদি এমন হয় যে, আমি ৫ লাখ টাকার মাইনিং সেটআপ প্রস্তুত করলে মাসে কি পরিমান ROI (return on investment) প্রত্যাশা করতে পারি? আসলে এই প্রশ্নের উত্তর সরাসরি দেওয়া সম্ভব না কারন এটা নির্ভর করে আপনার ব্যাবহৃত বিদ্যুতের দামের ওপর এবং ওই সময়ের বিটকয়েন এর দামের ওপর। তবে গড় পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে আনুমানিক হিসাব করলে সর্বোচ্চ ৮-১২% ROI প্রত্যাশা করতে পারেন। তবে সত্যি কথা বলতে ২০২২ সালে দাড়িয়ে বিটকয়েন মাইনিং খুব বেশি  লাভজনক নয় যদি না কেউ অতিরিক্ত কম খরচে বিদ্যুতের অ্যাক্সেস না পায়।


ব্যাক্তিগত মতামত

সবশেষে যদি আপনি প্রশ্ন করেন যে, বর্তমানে বাংলাদেশে বসে ক্রিপ্টোকারেন্সি মাইনিংকে পেশা হিসাবে গ্রহন করা কতটা যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত হবে। তবে উত্তরে বলব, দেখুন ২০২২ সালের শেষের দিকে ইথারিয়াম প্রুফ অফ স্টেকে চলে আসছে। অর্থাৎ আপনি যদি বর্তমানে হার্ডওয়্যারে ইনভেস্ট করেন তবে ইথারিয়াম মাইন করার সুযোগ বেশি দিন পাবেন না। এদিকে বিটকয়েন হ্যাশ রেটও একের পর এক অলটাইম হাই বানাচ্ছে। যার ফলে মাইনিং হয়ে যাচ্ছে কষ্টসাধ্য। আর সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশে বিদ্যুতের দাম। বাংলাদেশে প্রতি ইউনিটের দাম সর্বোচ্চ ১১.৪৬ টাকা পর্যন্ত। এই অবস্থায় আপনার মাইনিং এর আয়ের থেকে বিদ্যুৎ বিলই বেশি আসবে। আর কম খরচে বিদ্যুৎ পাওযা যায় তবে খেয়াল রাখতে হবে মাইনিং হচ্ছে একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। পরামর্শ থাকবে যদি প্রবল আগ্রহ থাকে মাইনিং এর প্রতি তবে এটাকেই প্রধান পেশা হিসাবে বেছে না নেওয়ার।

Post a Comment

Previous Post Next Post