সম্প্রতি সময়ে ইথারিয়াম ২.০ এবং ইথারিয়াম মার্জ এর  কথা তো সবাই শুনেছেন নিশ্চয়। কোন সন্দেহ নেই যে পুরা ক্রিপ্টোস্পেসে এটা অনেক বড় একটা পরিবর্তন। এতো বড় পরিসরে কোন আপগ্রেডেশন এই পর্যন্ত হয়নি বললেই চলে। তবে সিংহভাগ ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনকারী বা ব্যবহারকারী এ ব্যাপারে বিস্তারিত তেমন একটা জানেন না। আজকে আমরা পয়েন্ট আকারে জানব যে ইথারিয়াম মার্জ বা ইথারিয়াম ২.০ আসলে কি। আপগ্রেডেশনের পর ইথারিয়ামের রোড ম্যাপ কেমন হবে। ইথারিয়াম ২.০ আপডেটের পর ইথারিয়াম ব্লকচেইনে কি কোন পরিবর্তন আসবে কিনা।  আপডেটের পর ইথারিয়ামের প্রাইসে কেমন প্রভাব পড়বে বা ইথারিয়াম ২.০ এর সুবিধা ও অসুবিধা সমূহ। তো চলুন শুরু করা যাক আমাদের আজকের আলোচনা।


ইথারিয়াম ২.০ কি

যে কোন ব্লকচেইনের সাধারনত তিনটি গুরুত্বপূর্ন অংশ থাকে।

*প্রথমটি হচ্ছে ডিসেন্ট্রালাইজেশন বা বিকেন্দ্রীকরণ। অর্থাৎ ব্লকচেইন ডিসেন্ট্রালাইজ হওয়া দরকার যাতে কোন কেন্দ্রীয় কতৃপক্ষের হাতে এটির নিয়ন্ত্রণ না থাকে।

*দ্বিতীয়টি হচ্ছে SCALABILITY অর্থাৎ কোন ব্লকচেইনের ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে ব্লকচেইনের সেই চাপ নেওয়ার ক্ষমতা থাকা।

*তৃতীয়টি হচ্ছে নিরাপত্তা অর্থাৎ ব্লকচেইন এতটা নিরাপদ হওয়া দরকার যাতে কোনপ্রকার হ্যাকিং থেকে সুরক্ষিত থাকে।

কিন্তু বর্তমানে যেসব ব্লকচেইন বিদ্যমান রয়েছে আপনি যদি তাদের দিকে তাকান তবে লক্ষ করবেন যে, প্রত্যেক ব্লকচেইনই এই তিনটির মধ্যে সর্বোচ্চ দুইটি বৈশিষ্ট পাওয়া যাবে। যেমন যদি বিটকয়েনের কথা বলি তবে বিটকয়েন ব্লকচেইন নিরাপদ এবং ডিসেন্ট্রালাইজ হলেও স্কেলেবল নয়। একইভাবে যদি ইথারিয়ামকে বিবেচনা করা হয় তবে বর্তমানে ইথারিয়াম নিরাপদ, ডিসেন্ট্রালাইজ তবে স্কেলেবল নয়। চলুন, আরেকটি জনপ্রিয় ব্লকচেইন সোলানার কথাই ধরা যাক। সোলানা ব্লকচেইন স্কেলেবল এবং নিরাপদও তবে ডিসেন্ট্রালাইজ নয়। এভাবে প্রত্যেক ব্লকচেইনেই তিনটির মধ্যে সর্বোচ্চ দুইটি কোয়ালিটি দেখা যায়। কোথাও না কোথাও কমতি রয়েই যায়। এখন ইথারিয়ামের পরিকল্পনা হচ্ছে ইথারিয়াম ব্লকচেইনে এই তিনটি কোয়ালিটিই প্রয়োগ করা। অর্থাৎ আগামী দিনে ইথারিয়াম ২.০ আসার পর ইথারিাম ব্লকচেইন ডিসেন্ট্রালাইজ, নিরাপদ এবং একইসাথে স্কেলেবল ও হবে। আশাকরি যে এখন পর্যন্ত এটা বুঝতে পেরেছেন যে ইথারিয়াম ২.০ আপগ্রেডেশনের পিছনে মূল উদ্দেশ্য কি!


বাস্তবায়নের ধাপ সমূহ

এখন কথা হচ্ছে এই তিনটি বৈশিষ্ট্য ইথারিয়াম ব্লকচেইনে বাস্তবায়ন করা হবে কিভাবে। এ ব্যাপারে ইথারিয়ামের ফাউন্ডার ভিটালিক বুটরিন বলেন ইথারিয়াম ব্লকচেইনকে আরও স্কেলেবল বানাতে আমাদের ইথারিয়ামের চলমান ম্যাকানিজম পরিবর্তন করে প্রুফ অফ স্টেকে চলে যেতে হবে। এখন আপনি বলতে পারেন প্রুফ অফ ওয়ার্ক বা প্রুফ অফ স্টেকের মাঝে পার্থক্যটা আসলে কোথায়। সংক্ষেপে বলতে গেলে বর্তমানে ইথারিয়াম নেটওয়ার্ক চলমান রাখতে প্রচুর কম্পিউটিং পাওয়ারের প্রয়োজন হয়। যেটা পরিবেশ বান্ধব নয় একইসাথে খরচ সাপেক্ষ এবং স্কেলেবল ও নয়। এখন যদি ইথারিয়াম প্রুফ অফ স্টেকে চলে যায় তবে বর্তমানে ব্লকচেইন চালানোর জন্য যে কম্পিউটিং পাওয়ারের প্রয়োজন হয় তখন সেটি আর প্রয়োজন হবে না। প্রুফ অফ স্টেকে আপনার কাছে কিছু নির্দিষ্ট পরিমান ইথারিয়াম থাকলে আপনি ইথারিয়াম নেটওয়ার্কের একজন যাচাইকারী(validator) বা ইথারিয়াম নেটওয়ার্কের অংশ হতে পারেন। বর্তমানে ইথারিয়াম এই পরিকল্পনায় করছে যে তারা প্রুফ অফ ওয়ার্ক থেকে প্রুফ অফ স্টেকে স্থানান্তরিত হয়ে যাবে যার ফলে ধীরে ধীরে স্কেলেবিলিটি ইস্যুও কমে আসবে।

এই যে পরিবর্তন, যেখানে ইথারিয়াম প্রুফ অফ ওয়ার্ক ব্লকচেইন থেকে প্রুফ অফ স্টেক ব্লকচেইনে পরিবর্তিত হয়ে যাবে এর প্রথম এবং সবচেয়ে বড় ইভেন্ট হল ইথারিয়াম মেইননেট মার্জ যেটা অনুষ্ঠিত হবে ১৯শে সেপ্টেম্বর যদি সবকিছু বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী আগায়। তবে আশানুরূপ ফলাফল পেতে মেইননেট মার্জের পরে আরও চারটি ইভেন্ট রয়েছে সেগুলোও সফলভাবে সম্পন্ন হওয়া দরকার। যেটা শেষ হতে আনুমানিক আরও প্রায় ৩ বছরের মত লাগতে পারে।


BEACON CAHIN MERGE

চলুন এবার ইথারিয়াম মার্জ কি এ ব্যাপারে একটু জানা যাক।
বর্তমানে যে ব্লকচেইনের উপর ইথারিয়াম নেটওয়ার্ক চলমান আছে সেটি হচ্ছে প্রুফ অফ ওয়ার্ক ব্লকচেইন। যেহেতু ইথারিয়াম প্রুফ অফ স্টেক ব্লকচেইনে স্থান্তরিত হতে যাচ্ছে তাই ইথারিয়াম প্রুফ অফ ওয়ার্ক ব্লকচেইনের পাশাপাশি (BEACON CHAIN) নামে আরও একটি ব্লকচেইন তৈরী করা হয় যেটা প্রুফ অফ স্টেকের উপর কাজ করে। মূলত ইথারিয়ামকে প্রুফ অফ স্টেক ব্লকচেইনে স্থান্তরিত করার উদ্দেশ্যেই ১লা ডিসেম্বর ২০২০ তারিখে BEACON CHAIN এর যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে অর্থাৎ ইথারিয়াম ২.০ আপগ্রেড সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার আগ পর্যন্ত ইথারিয়ামের মুল ব্লকচেইনের পাশাপাশি BEACON CHAIN ও দুটি ব্লকচেইনই একসাথে সক্রিয় রয়েছে। তবে বর্তমানে
BEACON CHAIN সম্পূর্ন খালি অবস্থায় রয়েছে। এখনো পর্যন্ত BEACON CHAIN এ কোন রকম লেনদেন কিংবা DAPPS এর কার্যক্রম শুরু হয়নি। আগামীতে যখন এই দুটি ব্লকচেইন একসাথে মিলে যাবে সেটাকেই ইথারিয়াম মেইননেট মার্জ ইভেন্ট বলা হচ্ছে। যেখানে ইথারিয়ামের যে প্রুফ অফ ওয়ার্ক ব্লকচেইন রয়েছে সেটা পুরাপুরি BEACON CHAIN এ স্থান্তরিত হয়ে যাবে এবং তখন ইথারিয়াম ব্লকচেইনের উপর প্রুফ অফ স্টেক সফলভাবে কার্যকর হয়ে যাবে। অর্থাৎ তখন ইথারিয়াম আর প্রুফ অফ ওয়ার্ক নয় বরং প্রুফ অফ স্টেক ব্লকচেইনের উপর কাজ করবে। আশা করি যে এখন বৃঝতে পেরেছেন এই ইভেন্টের নাম ইথারিয়াম মার্জ কেনো রাখা হয়েছে।


পরিবর্তন 

ইথারিয়াম মার্জ সফলভাবে হওয়ার পর ইথারিয়ামে যেসব পরিবর্তন আসতে পারে এখন সেগুলো নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক।

GAS FEE

ইথারিয়াম ২.০ আপগ্রেডেশনের এটা হচ্ছে প্রথম ধাপ যেখানে ইথারিয়াম সবেমাত্র প্রুফ অফ ওয়ার্ক থেকে প্রুফ অফ স্টেক ব্লকচেইনে চলে আসবে। তবে খেলা এখানেই শেষ নয় ২.০ আপডেটের পর ইথারিয়ামকে আরও স্কেলেবল বানাতে আরও চারটি আপগ্রেডেশন আনা হবে যেটা করতে আগামী ২-৩ বছরে সময় লাগতে পারে। আপগ্রেডেশন গুলো সফলবাভে সম্পন্ন হওয়ার পরেই ইথারিয়ামে বড় ধরনের কোন পরিবর্তন আশা করা যায়। সেই অনুযায়ী বলা যায় সেপ্টেম্বরের ১৯ তারিখ ইথারিয়াম মার্জ হয়ে গেলেও GASS FEE এর ক্ষেত্রে তেমন চোখে পড়ার মতো কোন পরিবর্তন আসবে না।

TRANSACTION SPEED

বলা হচ্ছে যে, একবার ইথারিয়ামের সমস্ত আপগ্রেডেশন সম্পন্ন হওয়ার পর যেটা হতে প্রায় ৩ বছরের মতো দরকার, তখন ইথারিয়াম ১ সেকেন্ডে ১ মিলিয়ন ট্রান্সেকসন্স সাপোর্ট করবে। যেটা অবশ্যই অনেক বড় একটি নাম্বার এবং এর মানে ইথারিয়াম খুব দ্রুতগতির একটি ব্লকচেইনে পরিনত হবে। যার জন্য ইথারিয়াম মার্জের পরের চারটি আপগ্রেডেট হওয়াটা জরুরী। ইথারিয়াম মার্জ তো এই পুরা আপগ্রেডেশনের অনেক ছোট একটা অংশ। এর কারনে ট্রান্সেকসন্স স্পিড হঠাৎ বেড়ে সেকেন্ডে ১ মিলয়ন তো হবে না তবে ১০% এর মতো বাড়তে পারে। বর্তমান ব্লকটাইম ১৩.৬ সেকেন্ড তখন সেটা কমে ১২ সেকেন্ডে চলে আসবে।

অন্যান্য সুবিধা

ইথারিয়াম প্রুফ অফ ওয়ার্ক থেকে প্রুফ অফ স্টেক ব্লকচেইনে যাওয়ার পর যেহেতু এর মাইনিং পদ্ধতি সম্পূর্ন পরিবেশ বান্ধব হয়ে যাবে ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রতি উৎসাহী হবে যারা বর্তমানে মাইনিং এর ফলে সংগঠিত পরিবেশ দূষনকে তাদের ক্রিপ্টোকারেন্সি বিমুখতার উল্লেখযোগ্য কারন হিসাবে দাবি করেন।


1 Comments

Post a Comment

Previous Post Next Post