সম্প্রতি বাংলাদেশের মাননীয় অর্থমন্ত্রী জনাব আ.হ.ম মোস্তফা কামাল ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ চেয়ে আইএমএফ অর্থাৎ (ইন্টারন্যাশনাল মনিটরি ফান্ড) এর নিকট আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছেন। এটা নিয়ে সামাজিক যেগাযোগ মাধ্যম সহ সমগ্র মিড়িয়া জুড়ে চলছে আলোচনা সমালোচনা। প্রশ্ন একটাই, বাংলাদেশ আবার শ্রীলংকার পথে আগাচ্ছে নাতো? এতো ঋণ পরিশোধ করার সক্ষমতা কি আদৌ আছে বাংলাদোশের? অথবা এতো বড় অংকের ঋণ নেওয়ার প্রয়োজনটাই বা কি? তবে বাংলাদেশ ঋণ নিতে চাইলেই যে আইএমএফ ও যে খুশিতে নাচতে নাচতে টাকা দিচ্ছে ব্যাপারটা মোটেও এমন না। ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে কিয়েকটি শর্ত আরোপ করেছে। সে শর্তগুলো আসলে কী কী? বাংলাদেশ কি সেসব শর্ত আদৌ মানবে কি না। মানলে অথবা না মানলে বাংলাদেশের কি লাভ বা ক্ষতি হতে পারে। এমন কিছু সংক্ষিপ্ত প্রশ্নের তথ্যবহুল উত্তর নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে আগামী কয়েক মিনিট। তো চলুন শুরু করা যাক।


ঋণ গ্রহনের প্রধান কারণসমূহ

বাংলাদেশ হয়তো নিজস্ব অর্থায়নে করা পদ্মা সেতু উদ্ভোদনের উত্তেজনার ঠেলায়, এই অর্থবছরে যেই বিশাল একটা বাজেট ঘোষনা করেছে যেটা প্রায় ৬ লক্ষ ৭৮ হাজার ৬৪  কোটি টাকা। উক্ত বাজেটের ঘাটতি পূরন করতে আইএমএফ থেকে নেওয়া ঋণের বাজেটের বড় একটা অংশ খরচ করা হবে, এবং এই ঋণের আরেকটা বড় অংশ বাংলাদেশ সরকার খরচ করবে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পরিবেশে যে বিরূপ প্রভাব দেখা দিচ্ছে সেটা মোকাবেলা করতে।

আন্তর্জাতিক অর্থনীতির নীতি অনুযায়ী, একটি স্থীতিশীল অর্থনীতির দেশ হতে হলে আপনার দেশ থেকে আমদানি খরচ বাবদ যত পরিমান টাকা দেশের বাইরে যাবে এবং যত পরিমান টাকা প্রবাসীদের রেমিটেন্স অথবা পণ্য, সেবা রপ্তানি করার মাধ্যমে দেশে আসবে এই দুইটির মাঝে সাম্যবস্থা থাকাটা জরুরী। যখন কোন দেশের আমদানি এবং রপ্তানি ব্যয়ের মাঝে কোন অসংগতি কিংবা ঘাটতি দেখা দেয় তখন সেই দেশের কাছে দুইটা পথ খোলা থাকে এ সমস্যা সমাধান করার। একটা উপায় হল দেশের ফরেন রিজার্ভ ব্যাবহার করা অপরটি হল ঋণ নিয়ে ঘাটতি পূরন করা। এক্ষেত্রে ফরেন রিজার্ভে হাত দেওয়াটা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ সেটা আপনারা হয়ত শ্রীলঙ্কার অবস্থা দেখেই বুঝতে পারছেন। তবে বাকি থাকে বিভিন্ন বৈদিশিক সংস্থা হতে ঋণ নেওয়া। দেশগুলো আইএমএফ এর মত সংস্থাগুলোর কাছে গিয়ে বলে যে, দেখ ভাই তুমি কি আমাকে কিছু ডলার ঋণ দিবা যেটা ব্যাবহার করে আমি ঘাটতি টা পূরন করতে পারি?


আচ্ছা ব্যাপারটা এমন নয় যে শুধুমাত্র বাংলাদেশই কেবল আইএমএফ এর কাছ থেকে ঋণ নিচ্ছে। এই মাসের শুরুর দিকেই আইএমএফ ঘোষনা দিয়েছে যে, তারা পাকিস্তানকে ৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিবে। একইভাবে তানজেনিয়া ঋণ নিচ্ছে ১.০৫ বিলিয়ন ডলার, পশ্চিম আফ্রিকার অন্যতম বৃহত্তম অর্থনীতির একটি দেশ ঘানা ও ১.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে বাংলাদেশ কিন্তু এর আগেও ৪ বার ঋণ নিয়েছিল। আইএমএফ এর কাছ থেকে বাংলাদেশ প্রথমবার ঋণ নিয়েছিল ১৯৯০-১৯৯১ সালে এরপর যথাক্রমে ২০০৩-২০০৪ সাল, ২০১১-২০১২ সাল এবং সবশেষে ২০২১-২০২২ সালে। তবে এরমধ্যে কোন সময় ঋণের পরিমান ১০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়নি। প্রতি ডলার ৯৪ টাকা করে হিসাব করলে এই ৪.৫ বিলিয়ন ডলারে হয় ৪২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এখন কথা হচ্ছে এত টাকা তো আইএমএফ আর এমনি এমনি দিচ্ছে না। সাথে কিছু শর্ত ও দিয়ে বসে আছে। তবে চলুন এবার জানা যাক আইএমএফের শর্তসমূহ


শর্ত  নাম্বার ১

জ্বালানী তেলে ভর্তুকি দেওয়া কমাতে হবে। ভর্তুকি মানে হচ্ছে মনেকরুন আন্তর্জাতিক বাজারের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশী টাকায় ১ লিটার জ্বালানী তেলের দাম ১২০ টাকা। এরমধ্যে সরকার কিছু টাকা নিজের পকেট থেকে দিয়ে তেলের দাম মোটামোটি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার চেষ্টা করে। এটাই হচ্ছে ভর্তুকি। এখন আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ জ্বালানী তেলের উপর আর কোন ভর্তুকি দেওয়া যাবে না। এই শর্ত আরোপের পিছনে অবশ্যয় যুক্তিসংগত কারনও আছে। সরকার যখন ভর্তুকি দেয় তখন তেলের দাম কম থাকছে ঠিকই তবে ভর্তুকির এই টাকা তো সরকার নিজের পকেট থেকে দেয় না। এই টাকা সাধারন জনগনেরই টাকা। এই টাকা সরকার জনগনের কাছ থেকে নিতে গিয়ে জনগনের উপর অতিরিক্ত কর আরোপ করে। আর আইএমএফের মতে এইভাবে কর নিতে থাকলে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়াও জনগনের এতো করের টাকা খরচ হচ্ছে কোথায়? জীবাশ্ম জ্বালানীর ভর্তুকি দিতে। বলে রাখা ভাল যে, তেল বা গ্যাস ব্যবহারের ফলে প্রচুর পরিমানে কার্বন নিঃসরন হয় যেটার বিপরীতে আইএমএফ সহ পুরা বিশ্ববাসী বিভিন্ন কর্মসূচী করে বেড়াচ্ছে। এই শর্ত মানলে সমস্যা কি তাহলে? সমস্যা একটা আছে। সমস্যা হল, জ্বালানী তেলের উপর থেকে যখন সরকারী ভর্তুকি সরিয়ে নেওয়া হবে তখন জ্বালানী তেলের দাম লাগামহীনভাবে বাড়তে থাকবে। ফলে পরিবহন খরচ বেড়ে যাবে। ট্রাকের ভাড়া বাড়ার কারনে ট্রাকের মধ্যে থাকা দ্রব্যমূল্যের দাম বেড়ে যাবে। এর প্রভাব চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে সবকিছুর উপরই পড়বে।

শর্ত নাম্বার ২

আইএমএফ আরও বলেছে যেসব শিল্প অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরন করে তাদের উপর কার্বন ট্যাক্স আরোপ করা হবে। অর্থাৎ আপনি যদি নির্দিষ্ট পরিমানের চেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরন করেন তবে আপনাকে অতিরিক্ত টাকা দিতে হবে সরকারকে।

অনেক অর্থনীতিবিদরা মনে করেন যে, এসব শর্তের কথা আইএমএফ উল্লেখ করার অনেক আগে থেকেই এসব নিয়ম বাংলাদেশের করা উচিৎ ছিল। আশাকরি যে আপনারা বুঝতে পেরেছেন যে কেনো আইএমএফ আসলে এই শর্ত গুলো দিয়ে থাকে। যদিও দেখে হচ্ছে যে শর্তগুলো তো আসলেই ভালো। তবে আইএমএফের সব শর্ত সবসময় এতো ভালো হয় না। আইএমএফের এসব শর্ত দেওয়ার পিছনে কারন হচ্ছ দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি করা। কারন দেশের অর্থনীতিই যদি ঠিক না থাকে তবে আপনি তো আইএমএফের ঋণের টাকা ফেরত দিতে পারবেন না। এখন সব প্রশ্ন একটা জায়গায় গিয়ে শেষ হয় সেটা হচ্ছে তবে কি তেলের দাম এতোটা বাড়ানোর মুল কারন  আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া?

আপনার কি মনে হয়?


ব্যাক্তিগত মতামত

বর্তমানে বাংলাদোশের মাথাপিছু ঋণের পরিমান প্রায় ৯৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ কিছুদিন পর যে শিশুটা বাংলাদেশের মাটিতে জন্ম নিবে সে তার মাথায় ১ লাখ টাকার ঋণের বোঝা নিয়েই পৃথিবীতে আসবে। গত দশবছরে বাংলাদেশের ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৬৭ ভাগ। এই যে ঋণের উপর ঋণ দিয়ে এতো উন্নয়ন প্রকল্পের বোমা ফাটানো হচ্ছে বাংলাদেশ কি আসলে এ ঋণ ফেরত দেওয়ার ক্ষমতা রাখে? এখনও অনেক ঋণের কিস্তি দেওয়াই শুরু হয়নি তবুও এখন থেকে রিজার্ভে টান পড়া শুরু হয়ে গেছে। এর উপর আবার আইএমএফের নতুন ঋণ। আপনারা হয়ত ভাবতে পারেন যে, আদা বেপারির জাহাজের খবর নিয়ে লাভ কি। অবশ্যই ভাবতে হবে কারণ এই ঋণের প্রত্যকটি পয়সা আমাকে আর আপনাকেই পরিশোধ করতে হবে।


১১ই জুন ২০২২ সালের যুগান্তর পত্রিকার তথ্য আমাদের বলছে বর্তমান মাথাপিছু ঋণ ৯৬ হাজার টাকা। অথচ, ১৯৭১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ৩৭ বছরে  বাংলাদেশের মাথাপিছু পরিমান ছিল ৬ হাজার টাকা। যেটা বর্তমানে মহা উন্নয়নের ঠেলায় বেড়ে প্রায় ১৬ গুনে ঠেকেছে। এরপরেও সরকার এদিক ওদিক হাতরাচ্ছে ঋণের খোজে। যেটা বাংলাদেশের অর্থনীতি বিবেচনায় মোটেও সমীচীন নয়।


Post a Comment

Previous Post Next Post