বর্তমানে বাংরাদেশের চায়ের দোকান থেকে শপিংমল, সংসদ থেকে অর্থনীতিবিদের গবেষণাকেন্দ্র সব জায়গায় সবার আলোচনার এবং চিন্তার মূল কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে, বাংলাদেশ অর্থনীতৈক দিক থেকে কতটা নিরাপদ। বাংলাদেশ কি শ্রীলংকার পথে আগাচ্ছে? তবে বাংলাদেশ আর্থিক সংকটে পড়বে কিনা এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তু হচ্ছে যদি বাংলাদেশ তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে পড়েও যায় তাহলে আমরা কিভাবে অর্থনৈতিক ক্ষতি থেকে সুরক্ষিত থাকতে পারি। আজকে আমরা এটা নিয়েই আলোচনা করব যে, বাংলাদেশে বসে এখন থেকে আপনার কি কি পদক্ষেপ নেওয়া উচিৎ আপনার অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতে। প্রবাসী ভাইদের জন্যও কিছু পরামর্শ থাকবে যাতে আপনার আপনজন থেকে দূরে সরে বহুল কষ্টে অর্জিত অর্থের একটা পয়সাও যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।


বাংলাদেশ কি অর্থনৈতিক সকটে পড়তে পারে?

বর্তমানে চরম অর্থনৈতিক সংকটে ভোগা দেশগুলোর মধ্যে উদাহরন হিসাবে শ্রীলংকার নাম খুর জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে। বলে বাখা ভাল শ্রীলংকা কিন্তু বাংলাদেশের চেয়ে বহুগুনে উন্নত দেশ ছিল। ৯৫ শতাংশের কাছাকাছি ছিল তাদের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা। শ্রীলঙ্কান নাগরিকদের জীবনযাত্রার মানও ছিল বাংলাদেশের চেয়ে উন্নত। সম্প্রতি সেই দেশ এখন ঋণের ভারে জর্জরিত। মুদ্রাস্ফীতি এমনভাবে বেড়েছে যে ১ বস্তা চালের দাম পরিশোধ করেও ১ কোজি চাল মিলছে না। নেই চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ এবং জ্বালানীর যোগানও। বাধ্য হয়ে দেওলিয়াত্ব ঘোষনা করতে হয়েছে দেশটিকে। আচ্ছা একটু ভালো করে ভেবে উত্তর দিন তো, শ্রীলংকার অর্থনীতির এই অবস্থা শুরু হওয়ার ৬ মাস কিংবা ১ বছর আগেও কি কোন অর্থনীতিবিদ বা কোন মিডিয়া কি বিন্দুমাত্র পূর্বাভাস দিয়েছিল। সব বাদ দিন দেশটির সরকার কি কখনো প্রকাশ করেছে যে তারা ঋণের চাপে কাহিল বা এসম্পর্কে কোন সংবাদ সম্মেলন, বৈঠক করতে দেখেছেন? হঠাৎ করেই একের পর এক জরুরী অবস্থা জারী করা হল। ১ মাসের মধ্যেই নাকি দেশ দেউলিয়া। জ্বালানী তেল নাই খাবার জন্য চাল, ডাল ও নাই। কোন দেশের প্রধানমন্ত্রী বা সরকার পক্ষের লোক কখনো প্রকাশ করবে না যে আমরা হয়ত সামনে অর্থনৈতিক সংকটের মুখামুখি হতে চলেছি। অধিকাংশ মিডিয়া গুলোও তেলবাজি করে যাবে। হঠাৎ দেখবেন বাংলাদেশেও শ্রীলংকার মত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বর্তমানে বাংলাদেশ কতটা ঝুকির মধ্যে আছে সেটা অনুধাবন করতে আপনার কোন সরকার পক্ষের লোক বা কোন মিডিয়ার উপর নির্ভর করতে হবে না। বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং ঋণ সম্পর্কে একটু খোজখবর নিলেই দিনের আলোর মতো দেখতে পাবেন বাংলাদেশের ভবিষ্যত। বর্তমানে বাংলাদেশ যে বেপরোয়া ভাবে ঋণ গ্রহন এবং বৈধ দুর্নীতি করে যাচ্ছে এভাবে চলতে থাকলে হয়ত বেশিদিন লাগবে না দেখবেন মার্কিন পত্রিকায় খবর ছাপা হবে বাংলাদেশ দেউলিয়াত্ব ঘোষনা করোছে। অর্থাৎ আমি আপনাকে বুঝাতে চাচ্ছি যে বর্তমান মিডিয়ার পরিসংখ্যান মূলক তথ্যে বিভ্রান্ত না হয়ে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতি নিন। আমি এমনটা বলছি না যে, বাংলাদেশেরও শ্রীলংকার অবস্থা হতে পারে। তবে বাংলাদেশে ইতিমধ্যে শ্রীলংকার কিছু লক্ষণ ফুঠে উঠেছে যেমন শ্রীলংকায় মুদ্রাস্ফীতির জ্বালানী তেলের মূল্য অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় লাইনে দাড়িয়ে থেকেও তেল পাননি, বাংলাদেশেও জ্বালানী তেলের দাম একলাফে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। ঋণ পরিশোধ করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ছিল না শ্রীলংকার রিজার্ভে, কিছুদিনের মধ্যে বাংলাদেশের মাথাপিছু ঋণ প্রায় ১ লাখ টাকায় গিয়ে ঠেকবে ইতিমধ্যে বাংলাদেশের ফরেন রিজার্ভেও টান পড়েছে। এখনো অনেক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করাই শুরু হয়নি এখন থেকে সরকার আমদানি ব্যয় মেঠাতে আবার আইএমএফ এর কাছে ঋণের জন্য হাত পাতা শুরু করেছে। লোডশেডিং শ্রীলংকায় কেমন ছিল সেটা তো সবার জানা কথা আর বাংলাদেশের অবস্থা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এবং ঋণের বিস্তারিত তথ্য জানতে পড়তে পারেন। অযথা সরকারপক্ষের গালগল্প না শুনে নিজে নিজে হিসাব মিলিনোর চেষ্টা করুন। শ্রীলংকার মতো না হলেও ছোট পরিসরেও যদি কোন সংকট দেখা যায় তবে সেটার জন্য আগাম প্রস্তুতি গ্রহন করাই হবে একজন বুদ্ধিমানের কাজ।


বাংলাদেশে বসে কি কি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে?

আপনি হয়ত বলতে পারেন বাংলাদেশ যদি অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে তবে দেশের মধ্যে থাকা সর্বস্তরের মানুষ আক্রান্ত হবে। আমরা সুরক্ষিত থাকব কিভাবে? যদি এখন থেকেই সুপরিকল্পিত ভাবে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহন করা হয় তবে অবশ্যয় অর্থনৈতিক সংকট খুব ভালোভাবেই মোকাবিলা করা সম্ভব। কিভাবে সেটাও ব্যাখ্যা করছি একটু পর। দেখুন বাংলাদেশে যদি শ্রীলঙ্কার মত অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয় তবে এর প্রথম প্রভাব আসবে বাংলাদেশী মুদ্রার উপর। মুদ্রাস্ফীতি অতিরিক্ত হারে বেড়ে যাবে ফলে আপনার ১ লাখ টাকা দিয়ে হয়ত ৫ লিটার অকটেন, আর ৫ কেজি চাল কিনতে পারবেন। কারন টাকার মান  অপ্রত্যাশিত ভাবে কমে যাবে। এখন যেখানে ১ ডলারে ৮৪ টাকা তখন সেটা দাড়াবে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায়। আচ্ছা চলুন এবার ধরে নিই যে, বর্তমানে বাংলাদেশ চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যদিয়ে যাচ্ছে এবং আপনার ব্যাংক একাউন্টে আপনার ব্যক্তিগত সঞ্চয় হিসাবে ১০ লাখ টাকা রেখেছিলেন। আগে যদি ১০ লাখ টাকায় আপনি ১ বছর শুয়ে বসে কাটাতে পারতেন তবে সংকটকালীন সময়ে একই পরিমান টাকা দিয়ে আপনার ২ মাস চালাতে কষ্ট হয়ে যাবে। তবে সমাধান কি? সমাধান হচ্ছে বর্তমানে আপনার টাকা ব্যাংকে না রেখে বিনিয়োগ করুন। বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও আবার সাবধান থাকতে হবে, আপনি যদি বর্তমানে ১০ লাখ টাকায় কোন জমি বা ফ্ল্যাট কিনে রাখেন এই চিন্তায় যে আপনি সংকটকালীন সময়ে নিরাপদ থাকবেন তবে আপনাকে হতাশ হতে হবে। কারন সংকট চলাকালীন সময়ে সাধারন মানুষ জমি বা ফ্ল্যাট দিয়ে কি করবে যদি চালের কেজি ২ হাজার টাকা হয়ে যায়। ১০ হাজার টাকা দিয়েও যদি রান্নার জন্য গ্যাস পাওয়া না যায়। আশেপাশে লক্ষ করলেই দেখতে পাবেন যে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সাধারন মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে উদাহরন হিসাবে ডিমের কথায় ধরা যেতে পারে। এলাকাভেদে এক ডজন ডিম ১৮০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে তবে বিনিয়োগ করব কোথায়। ঝুঁকির উপর ভিত্তি করে বেশ কয়েকটি বিনিয়োগ পদ্ধতি এবং এদের সুবিধা অসুবিধা সম্পর্কে।


ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগ

বর্তমানে ঝুকিমুক্ত বিনিয়োগ বলতে একমাত্র স্বর্ণই রয়েছে। স্বর্ণ এমন একটি ধাতু যেটা মুদ্রাস্ফীতি, অর্থনৈতিক সংকট অথবা যে কোন ধরনের মহামারীর বিরুদ্ধে রক্ষাকবচ হিসাবে কাজ করে। স্বর্ণের দাম কমার চেয়ে বাড়ার প্রবণতাই বেশি। এটি ঝুকিমুক্ত ও লাভজনক বিনিয়োগ হওয়ার পিছনে কারন হল স্বর্ণের দাম বেশ স্থিতিশীল। কাগজের মুদ্রা বা অন্যান্য পুঁজি বাজারের মত এর দাম উঠানামা করে না। এখন ধরুন আপনার কাছে ২০ গ্রামের মতো স্বর্ণ মজুদ আছে যার বাজার মূল্য ১০ লাখ টাকা। বাংলাদেশে হঠাৎ শ্রীলঙ্কার অবস্থা। বাংলাদেশী মুদ্রার মান এমনভাবে কমেছে যে প্রতি ডলারে ৯০০ টাকা। এখন আপনি যদি বাংলাদেশের বাজারে আপনার সেই ১০ লাখ টাকার স্বর্ণ বিক্রি করেন তবে আপনি পাবেন প্রায় ৯৬ লাখ টাকার কাছাকাছি। আগে ১০ লাখ টাকা দিয়ে আপনার যেই কয়মাস চলত এখন আপনি এই ৯৬ হাজার টাকা দিয়ে তার কাছাকাছি সময় খুব ভালোভাবেই কাটাতে পারবেন। অথবা আপনি চাইলে সেই ১০ লাখ টাকার স্বর্ণ অন্য কোন দেশের বাজারেও বিক্রি করতে পারেন। মনেকরুন আপনি দুবাইতে আপনার স্বর্ণ বিক্রি করলেন। বিক্রি করে মনে করুন ৪০ হাজার দিরহাম পেলেন। এখন আপনার সেই ৪০ হাজার দিরহাম এবং আপনি যখন স্বর্ণ ক্রয় করেছিলেন তখনকার ১০ লাখ টাকার মান প্রায় কাছাকাছি। এরমধ্যে যদি আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম বেড়ে যায় তবে তো অতিরিক্ত দাম পাবেন। আশা করি যে বুঝতে পেরেছেন কিভাবে স্বর্ণে বিনিয়োগের মাধ্যমে আপনি অর্থনৈতিক দিক থেকে সুরক্ষিত থাকতে পারেন।

তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ন বিনিয়োগ

ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ বলতে আমি জুয়া খেলার মতো অতিরিক্ত কোন ঝুকির কথা বলছি না। তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ বলতে স্বর্ণে বিনিয়োগের তুলনায় সামান্য ঝুঁকি রয়েছে। এক্ষেত্রে আপনি যদি ব্যাবসায়ীক মানসিকতা সম্পন্ন মানুষ হন তবে আমি আপনাকে পরামর্শ দিব বিটকয়েন। অন্য কোন ক্রিপ্টোকারেন্সি নয় শুধুমাত্রই বিটকয়েন। এক্ষেত্রে আবার উচ্চমূল্যে কিনার একটা ভয় থাকে। তবে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকলে বা SIP এর মাধ্যমে বিটকয়েনে বিনিয়োগ আমার মতে একটি ভাল পদ্ধতি। এছাড়া আপনি যদি বিটকয়েনের দাম বাড়া কমার ঝামেলায় না পড়তে চান তবে আপনি চাইলে স্টেবলকয়েনেও বিনিয়োগ করতে পারেন, এক্ষেত্রে আপনার বিনিয়োগ বাড়ার বা কমার কোন সুযোগ নেই। তবে অবশ্যই বিশ্বাসযোগ্য স্টেবলকয়েন হওয়া জরুরী।


স্টক মার্কেটে বিনিয়োগ করলে কি সমস্যা?

আপনি যদি বাংলাদেশের স্টক মার্কেটে বিনিয়োগ করেন তবে বাংলাদেশের অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়ার সাথে সাথে স্টক মার্কেটের অস্বাভাবিক দরপতন হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। কারন দেশে যখন মানুষ দুইবেলা খাবার জন্য হাহাকার করে তখন ঘড়ি, গাড়ি, প্রসাধনী বা অন্যান্য বিলাশবহুল পণ্য কে কিনবে। স্বাভাবিকভাবেই কোম্পানি গুলোর বিক্রি কমে যাবে। আর কোম্পানির বিক্রি কমলে সেটার প্রভাব তাদের স্টকের দামেও পড়বে। এছাড়া আরও একটা সমস্যা আছে। দেশের অর্থনীতি যখন ঠিক থাকবে না সাধারন মানুষ অর্থের নিরাপত্তার জন্য তাদের সমস্ত বিনিয়োগকৃত টাকা ক্যাশ করা শুরু করে দিবে। অধিক পরিমানে স্টক বিক্রি হওয়া শুরু করলে স্টকের দরপতন নিশ্চিত। যেমনটা আমরা কোভিডের সময় দেখেছিলাম।


প্রবাসী ভাইরা কি পদক্ষেপ নিতে পারেন?

প্রবাসীরাও উপরে উল্লেখ করা ব্যাবস্থাগুলোর মধ্যে যেকোন একটি গ্রহন করতে পারেন। সাথে সাথে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ প্রবাসীরা গ্রহন করতে পারেন। সেটা হচ্ছে প্রয়োজনের বাইরে অতিরিক্ত টাকা বাংলাদেশে পাঠানো থেকে বিরত থাকুন। কারন আপনার কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে দূর্নীতিবাজদের পকেট ভারি হচ্ছে। দেশের অবস্থা খারাপ হচ্ছে হতে দিন। আপনি আর আমি চাইলেই একা কিছু করতে পারবো না। তবে চাইলে আমরা একটা কাজ করতে পারি, সেটা হচ্ছে নিজের এবং নিজের পরিবারের সুরক্ষা।


ব্যাক্তিগত মতামত

যদি সংক্ষেপে আমার মতামত দিতে হয় তাহলে বলব, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা মোটেও ভালো না। বর্তমানে বাংলাদেশে নীরব দুর্ভিক্ষ চলছে। আপনার আশেপাশে থাকা কয়েকটি নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের দিকে তাকালেই সেটা বুঝতে পারবেন। পরামর্শ থাকবে বাংলকদেশী টাকা মোটেও জমা রাখবেন না। আর প্রবাসীরা দেশে প্রয়োজনের বেশি টাকা পাঠাবেন না।সরকার যখন শ্রীলংকার অবস্থা দেখেও শিক্ষা গ্রহন করে না তখন সময় নিজের সুরক্ষা নিজেই চিন্তা করার। জরুরী নয় যে আমার কথামত বাংলাদেশ আগামী কয়েকমাসে দেউলিয়াত্ব ঘোষনা করবে। তবে সম্ভাবনা রয়েছে বিশেষকরে, যদি চলমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকে।

Post a Comment

Previous Post Next Post